ওয়াশিংটন-তেহরান ঐতিহাসিক সমঝোতা: খুলছে হরমুজ প্রণালী, বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন
ইসলামাবাদ / জেনেভা — গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত অবশেষে একটি চূড়ান্ত সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে。
সোমবার ওয়াশিংটন এবং তেহরান যৌথভাবে একটি ব্যাপকভিত্তিক ১৪-দফা রূপরেখা অনুমোদন করেছে, যার লক্ষ্য এই অঞ্চলে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠা করা এবং দীর্ঘদিন ধরে অবরুদ্ধ থাকা সামুদ্রিক জ্বালানি করিডোরগুলো অবিলম্বে সচল করা。
পাকিস্তানি ও কাতারি কূটনীতিকদের পর্দার আড়ালের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় তৈরি হওয়া এই ঐতিহাসিক ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’ (Islamabad Memorandum of Understanding) আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে একটি দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হবে。
এই সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির খবর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে এনেছে। সপ্তাহের শুরুতে এশিয়ার বাজারে লেনদেনের শুরুতেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে; ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেল প্রতি ৩.৮% কমে ৮৪.০২ ডলারে নেমে এসেছে, যা গত তিন মাসের সামুদ্রিক সংকটের কারণে তৈরি হওয়া তীব্র মূল্যস্ফীতি থেকে বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরণের স্বস্তি দেবে。
১৪-দফা চুক্তি: ৬০ দিনের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ‘মেহর নিউজ এজেন্সি’ এই ১৪-দফার খসড়া সমঝোতার যে বিবরণ প্রকাশ করেছে, তাতে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে একটি ধাপে ধাপে সুসংগত ডি-এস্কেলেশন (উত্তেজনা প্রশমন) প্রোটোকল নির্ধারণ করা হয়েছে:
আঞ্চলিক যুদ্ধবিরতি: সমস্ত অপারেশনাল থিয়েটার বা যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক অভিযান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হবে, যেখানে লেবাননের অভ্যন্তরে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ম্যান্ডেট রয়েছে।
অবরোধ প্রত্যাহার: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নৌবন্দরগুলোর ওপর থেকে তাদের সমস্ত অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধ সম্পূর্ণভাবে তুলে নিতে সম্মত হয়েছে। একই সময়ে, ইরানও "নিজস্ব ট্রানজিট ব্যবস্থার অধীনে" সমস্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালী’ স্থায়ীভাবে খুলে দেবে।
পারমাণবিক যাচাইকরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরান পুনরায় এই বিষয়ে তার কঠোর কূটনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে যে তারা কখনই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি বা অর্জন করবে না। এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর থাকা সবধরণের সক্রিয় জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করবে। তবে তেহরান শর্ত দিয়েছে যে, বিভিন্ন বিদেশী ব্যাংকে আটকে থাকা তাদের ফ্রিজড (স্থগিত) সম্পদের অন্তত ৫০% আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত না করা পর্যন্ত চূড়ান্ত পর্যায়ের আলোচনা আর সামনে বাড়বে না।
৩০০ বিলিয়ন ডলারের পুনর্গঠন তহবিল: এই সমঝোতা স্মারকে ইরানের অভ্যন্তরীণ সার্বভৌম বিষয়ে ওয়াশিংটনের কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ না করার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার জি-৭ (G7) সহযোগীরা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোর জন্য একটি ৩০০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধোত্তর অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্যাকেজ তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্বীকৃতি: এই চুক্তির দীর্ঘমেয়াদী বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিটিকে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের (UN Security Council Resolution) মাধ্যমে আইনিভাবে সুরক্ষিত করা হবে。
তেহরানে মধ্যরাতের কূটনৈতিক নাটক
এই চুক্তিটি বাস্তবায়ন হওয়াকে আন্তর্জাতিক মহলে একটি অলৌকিক কূটনৈতিক উদ্ধার হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ রবিবার সকালেই এই পুরো আলোচনা প্রক্রিয়াটি প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়েছিল, যখন ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) দক্ষিণ বৈরুতে একটি হিজবুল্লাহ কমান্ড সেন্টারে তীব্র বিমান হামলা চালায়। এই হামলায় ৩ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হন।
এই হামলায় ক্ষুব্ধ হয়ে ইরানের প্রধান মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ-বাঘের গালিবাফ প্রাথমিকভাবে পরবর্তী শান্তি আলোচনাকে "অর্থহীন" বলে ঘোষণা করেছিলেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আঞ্চলিক মিত্রকে নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।
তবে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক প্রতিনিধি দল সরাসরি তেহরানে উড়ে গিয়ে এই বিপর্যয় এড়াতে সক্ষম হয়। কাতারি প্রতিনিধিরা তেহরানে টানা ১৫ ঘণ্টার একটি ম্যারাথন আলোচনা বৈঠক পরিচালনা করেন, যেখানে তারা ইরানের শেষ মুহূর্তের সংশোধনীগুলো চুক্তির টেক্সটে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হন এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো থেকে ইরানি নেতৃত্বকে বিরত রাখেন。
আলোচনার এই জটিল শেষ মুহূর্তে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে একটি জরুরি জননিরাপত্তা আপিল জারি করে লিখেছিলেন:
"এই হামলাটি মোটেও হওয়া উচিত ছিল না, বিশেষ করে এমন একটি বিশেষ দিনে যখন আমরা ইরানের সাথে একটি শান্তি চুক্তির এত কাছাকাছি রয়েছি। সব পক্ষেরই এখন শান্ত হওয়া উচিত... কোনোভাবেই যেন এটি হাতছাড়া না হয়!"
জয়ের দাবি বনাম আসল বাস্তবতা
প্রাথমিক এই সাফল্য সত্ত্বেও, অভিজ্ঞ কূটনীতিকরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, ওয়াশিংটন এবং তেহরান উভয় পক্ষই এখন নিজেদের অভ্যন্তরীণ জনগণের কাছে এই চুক্তিটিকে নিজেদের একক বিজয় হিসেবে প্রমাণ করার জন্য ব্যাপক প্রচারণামূলক যুদ্ধ বা 'পাবলিক রিলেশনস স্পিন' শুরু করেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প যেমন দাবি করেছেন, "এই মহান চুক্তিটি পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আসবে। তেল আবার স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হবে এবং আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বার্থ স্থায়ীভাবে সুরক্ষিত থাকবে।" অন্যদিকে, ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেশটির শীর্ষ সামরিক কমান্ড ঘোষণা করেছে, "আমাদের সশস্ত্র বাহিনী সফলভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে, অবৈধ পশ্চিমা অবরোধ ভেঙে দিয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির ওপর একটি কাঠামোগত পশ্চাদপসরণ চাপিয়ে দিয়েছে।"
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রশাসনের এই অবস্থানকে জোরালোভাবে সমর্থন করে বলেছেন যে, এই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক হুমকি নিয়মতান্ত্রিকভাবে দূর করে "আগামী ৫০ বছরের জন্য মধ্যপ্রাচ্যকে মৌলিকভাবে বদলে দেওয়ার" কাঙ্ক্ষিত সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে。
জি-৭ সম্মেলন এবং কিছু অমীমাংসিত শঙ্কা
এই চুক্তির ঘোষণাটি ফ্রান্সের লেকসাইড রিসোর্ট ‘ইভিয়ান-লেস-বেঁ’-এ শুরু হওয়া বার্ষিক জি-৭ (G7) শীর্ষ সম্মেলনের এজেন্ডাকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছে। আয়োজক দেশের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ নিশ্চিত করেছেন যে, জোটের নেতারা অবিলম্বে এই চুক্তি সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনায় বসবেন।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ বিশ্ব অর্থনীতির এই স্থিতিশীলতাকে স্বাগত জানালেও, চুক্তির কিছু বড় দুর্বলতা বা 'ব্লাইন্ডস্পট' নিয়ে গভীর সংশয় রয়েই গেছে:
১. ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ ফ্যাক্টর: চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হলেও, এই দ্বিপাক্ষিক মার্কিন-ইরান আলোচনায় ইসরায়েল কোনো পক্ষ ছিল না। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান বন্ধ করার কোনো লক্ষণ দেখাননি। ফলে যেকোনো একটি অনাকাঙ্ক্ষিত রকেট হামলা এই পুরো যুদ্ধবিরতিকে মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিতে পারে। ২. বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিলম্ব: আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলো পারস্য উপসাগরে ফিরে আসার জন্য উদগ্রীব হলেও, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি সংস্থা ‘অ্যাডনক’ (ADNOC) সতর্ক করেছে যে, সাগরে মাইনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত শঙ্কা দূর হতে সময় লাগবে। ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক তেল সরবরাহ পুরোপুরি স্থিতিশীল হতে আগামী বছরের প্রথম বা দ্বিতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে。
