বাংলাদেশ বাজেট ২০২৬-২৭: সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ বাড়াচ্ছে তামাক ও গাড়ি; স্বস্তি দিচ্ছে চাল, মসলা ও আইটি খাত
ঢাকা — জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য ৯.৩৮ ট্রিলিয়ন টাকার নতুন বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপি সরকারের বর্তমান মেয়াদের এই প্রথম বাজেটে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং কাস্টমস শুল্কায়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক রদবদল আনা হয়েছে।
বাজেটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দেশীয় উৎপাদনকারী শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়া এবং পরিবেশ দূষণকারী ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার কমানো। একই সাথে, দীর্ঘদিনের লাগামহীন মূল্যস্ফীতি থেকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে চাল, ডাল, নিত্যপ্রয়োজনীয় মুদি পণ্য, কম্পিউটার প্রযুক্তি এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা হয়েছে।
🔺 ব্যয়ের তালিকা: যেসব পণ্যের দাম বাড়ছে
দেশীয় শিল্পকে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বাঁচাতে এবং ক্ষতিকর পণ্যের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে বেশ কিছু পণ্যের ওপর করের বোঝা বাড়ানো হয়েছে:
তামাক ও জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত যানবাহন
সিগারেট ও নিকোটিন: ধূমপানের খরচ বাড়াতে ১০ শলাকার সিগারেটের সর্বনিম্ন খুচরা মূল্য স্তরভিত্তিক করা হয়েছে: নিম্ন স্তর ৬২ টাকা, মধ্যম স্তর ৯২ টাকা, উচ্চ স্তর ১৬০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তর ২১০ টাকা। এছাড়া স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর নিকোটিন পাউচ ও গ্র্যানুলসের সম্পূরক শুল্ক ৩০০% থেকে বাড়িয়ে ৩৫০% করা হয়েছে।
জ্বালানি চালিত গাড়ি: পরিবেশ দূষণকারী ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল গাড়ির ব্যবহার কমাতে ১,২০০ সিসি থেকে ১,৬০০ সিসি ক্ষমতার মাঝারি রেঞ্জের গাড়ির ওপর মোট করের হার ১৩২.৩৬% থেকে বাড়িয়ে প্রায় ১৫৬% করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
রান্নাঘর ও আমদানিকৃত খাদ্যপণ্য
কাজুবাদাম: দেশীয় চাষাবাদে উৎসাহ দিতে প্রক্রিয়াজাত ও কাঁচা কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক বাড়িয়ে এক লাফে ২৫% করা হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানার সুরক্ষায় কাঁচা বাদাম আমদানিতে ১৫% শুল্ক থাকবে।
পাঙ্গাস ফিলেট ও মধু: দেশীয় মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সুরক্ষায় আমদানিকৃত পাঙ্গাস মাছের ফিলেটের ওপর ২০% সম্পূরক শুল্ক বসানো হয়েছে। আমদানিকৃত মধুর ন্যূনতম শুল্কায়ন মূল্য প্রতি ইউনিটে ২ ডলার বাড়িয়ে ৭ ডলার করা হয়েছে।
অন্যান্য খাবার: সুপারি আমদানিতে শুল্কায়ন মূল্য প্রতি ইউনিটে ০.২৫ ডলার বাড়ানো হয়েছে। এর বাইরে আমদানিকৃত কফি, চিনিযুক্ত কনফেকশনারি ও প্যাকেটজাত খাবারের ওপরও কাস্টমস শুল্কের বোঝা বাড়ছে।
শিল্প, ইলেকট্রনিক্স ও প্রসাধন
ওয়াশিং মেশিন ও ওভেন: স্থানীয়ভাবে ওয়াশিং মেশিন উৎপাদন বাড়াতে সব ধরনের আমদানিকৃত ওয়াশিং মেশিনের ওপর নতুন করে ২০% সম্পূরক শুল্ক বসেছে। একই সাথে আমদানিকৃত মাইক্রোওয়েভ ওভেন, খেলনা, ফোম, টাইলস ও স্যানিটারি সামগ্রীর দাম বাড়তে পারে।
বাইসাইকেল: স্থানীয় বাইসাইকেল তৈরির খরচ বাড়বে, কারণ এর অন্যতম যন্ত্রাংশ 'ফ্রি-হুইল' আমদানিতে শুল্ক ১৫% থেকে বাড়িয়ে ২৫% এবং সাথে আরও ৫% সম্পূরক শুল্ক যোগ করা হয়েছে।
রড ও গ্যাস সিলিন্ডার: রড তৈরির কাঁচামালে ভ্যাট বৃদ্ধি পাওয়ায় রডের দাম বাড়তে পারে। পাশাপাশি আমদানিকৃত কম্পোজিট এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট বসানো হয়েছে।
মেকআপ: আমদানিকৃত লিপ লাইনার এবং লিপ জেলের কাস্টমস শুল্কায়ন মূল্য বাড়ানো হয়েছে।
🔻 স্বস্তির তালিকা: যেসব পণ্যের দাম কমছে
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকার বাজেটে কর মওকুফ এবং নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি তুলে নিয়েছে:
নিত্যপণ্য ও মসলা বাজার
৬০টি অত্যাবশ্যকীয় পণ্য: চাল, ধান, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজ, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি ও মাছসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান ৫%, ২% এবং ১% উৎসে করের হার কমিয়ে মাত্র ০.৫% করা হয়েছে।
মসলা ও খেজুর: জিরা, দারুচিনি, এলাচ, লবঙ্গ, ধনে এবং গোলমরিচের ওপর থাকা ৫% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক (রেগুলেটরি ডিউটি) সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। একইভাবে আমদানিকৃত খেজুরের ওপর থেকেও ৫% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক তুলে নেওয়া হয়েছে।
শিশুখাদ্য: দেশে শিশুখাদ্য তৈরির কারখানার জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ১৫% থেকে কমিয়ে ১০% করা হয়েছে।
প্রযুক্তি ও সবুজ শক্তি
ল্যাপটপ ও কম্পিউটার: আইটি খাতের জন্য বিশাল সুখবর দিয়ে ল্যাপটপ, ডেক্সটপ কম্পিউটার, মনিটর, প্রিন্টার এবং সার্ভার আমদানির ওপর থেকে সব ধরনের আমদানি শুল্ক, নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট পুরোপুরি তুলে নেওয়া হয়েছে।
বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV): পরিবেশবান্ধব ইভি গাড়ির বাজার ধরতে বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে। ২৫,০০০ ডলার মূল্যের ইভি গাড়ির করের বোঝা ৯৩% থেকে কমিয়ে ৬৪% এবং ৫০,০০০ ডলার পর্যন্ত গাড়ির ক্ষেত্রে কর ৮০% করা হয়েছে। এছাড়া প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি ও চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রাংশ আমদানিতেও কর ছাড় মিলছে।
স্বাস্থ্য, বিনোদন ও বিলাসবহুল পণ্য
কিডনি ডায়ালিসিস ও ওষুধ: ডায়ালিসিস ফিল্টার আমদানির ওপর থেকে ১৫% ভ্যাট এবং ৫% অগ্রিম আয়কর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর ফলে প্রতি সেশনের ডায়ালিসিস খরচ রোগীদের জন্য প্রায় ৮০০ টাকা কমবে। ক্যানসারের ওষুধ তৈরির ৯টি নতুন কাঁচামালসহ অন্যান্য ওষুধ সামগ্রীতেও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে।
স্বর্ণের গহনা: স্বর্ণ সরবরাহের ওপর উৎসে কর ৫% থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫% করা হয়েছে। এর ফলে ২,৫০,০০০ টাকা মূল্যের প্রতি ভরি স্বর্ণের গহনায় করের পরিমাণ ১২,৫০০ টাকা থেকে কমে মাত্র ২,৫০০ টাকা হচ্ছে।
বাদ্যযন্ত্র ও সিনেমা সরঞ্জাম: গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদির ওপর থাকা ৫% নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল হয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের আমদানি শুল্ক ১৫% থেকে কমিয়ে ৫% করা হয়েছে।
ত্বকের যত্ন: লিপ লাইনারের দাম বাড়লেও শুল্ক কাঠামোর সুবিধার কারণে আমদানিকৃত লিপস্টিক ও ফেসওয়াশের দাম বাজারে কমতে পারে।
