লন্ডন/তেহরান — ইরানের আকাশজুড়ে এখন কেবল কৃত্রিম উপগ্রহের আনাগোনা নয়, বরং সেগুলোকে ঘিরে চলছে এক রোমাঞ্চকর এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এক অভিযান। দেশজুড়ে সরকারের কঠোর ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞার দেয়াল টপকাতে ইরানের ভেতরে পাচার হচ্ছে ইলন মাস্কের স্পেস-এক্স কোম্পানির তৈরি ‘স্টারলিংক’ টার্মিনাল। এক গোপন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এই অবৈধ প্রযুক্তি সীমান্ত পেরিয়ে পৌঁছে যাচ্ছে সাধারণ মানুষের হাতে।


অন্ধকারে আলোর রেখা: কেন এই স্টারলিংক?

গত কয়েক মাস ধরে ইরান কার্যত এক ডিজিটাল অন্ধকারে নিমজ্জিত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই নজিরবিহীন ব্ল্যাকআউটের ফলে সাধারণ মানুষ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সরকার দাবি করেছে, নিরাপত্তা এবং বিদেশি গোয়েন্দাগিরি ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ। তবে এই নিরবতা ভেঙে দিচ্ছে সাদা রঙের ছোট ছোট স্টারলিংক ডিশগুলো। এগুলো সরাসরি স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কোনো স্থানীয় টাওয়ার বা সার্ভার ছাড়াই বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেটের অ্যাক্সেস দিচ্ছে।

বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে 'সাহান্দ' (ছদ্মনাম) নামে এক ব্যক্তি জানান, প্রবাসে থাকা ইরানীদের অর্থায়নে এই চড়া দামের ডিভাইসগুলো কেনা হয় এবং অত্যন্ত জটিল ও গোপন পথে সেগুলো সীমান্তে পাচার করা হয়।

কঠোর শাস্তি ও ধরপাকড়

ইরানি আইন অনুযায়ী, স্টারলিংক ব্যবহার করা এখন এক বড় অপরাধ। দেশটির নতুন আইন অনুযায়ী:

  • ব্যবহার বা বিক্রি: স্টারলিংক ব্যবহার করলে কমপক্ষে ২ বছর কারাদণ্ড হতে পারে।

  • বড় আকারের পাচার: ১০টির বেশি ডিভাইসসহ ধরা পড়লে সাজা হতে পারে ১০ বছর পর্যন্ত

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অন্তত ১০০ জনকে ইতিমধেই এই অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এমনকি কয়েকজনের বিরুদ্ধে ‘গুপ্তচরবৃত্তি’র অভিযোগও আনা হয়েছে। তবে শত বিপত্তি সত্ত্বেও ইরানে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার স্টারলিংক টার্মিনাল সচল রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডিজিটাল বৈষম্য ও 'ইন্টারনেট প্রো'

ইরানের বর্তমান ইন্টারনেট ব্যবস্থাকে একটি ‘স্তরবিন্যাস’ হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। যেখানে সাধারণ মানুষ বিচ্ছিন্ন, সেখানে প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের জন্য রয়েছে বিশেষ 'হোয়াইট সিম কার্ড', যা দিয়ে তারা অবাধে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারছেন।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ধস ঠেকাতে সরকার 'ইন্টারনেট প্রো' নামে একটি স্কিম চালু করেছে, যার মাধ্যমে কেবল বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই ব্ল্যাকআউটের কারণে দেশটির অর্থনীতির প্রতিদিন প্রায় ৩৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি হচ্ছে।

সত্য প্রকাশের লড়াই

পাচারকারী নেটওয়ার্কের সদস্যরা বলছেন, এটি কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং এটি বাঁচার লড়াই। গত জানুয়ারির গণবিক্ষোভের সময় যখন সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন এই স্টারলিংক ব্যবহার করেই রাজপথের নৃশংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভিডিওগুলো বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছিল।

সাহান্দের ভাষায়, "সরকার চায় নিরবতায় সবকিছু ধামাচাপা দিতে, আর আমাদের লড়াই হলো সেই নিরবতা ভেঙে মানুষের কণ্ঠস্বরকে বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়া।"

বিশ্ব সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিবস বা ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে-র প্রাক্কালে ইরানের এই পরিস্থিতি ডিজিটাল যুগে তথ্যের অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে বিশ্বকে।