যৌথ অভিযানের বড় সাফল্য: নাইজেরিয়ায় খতম আইসিসের বৈশ্বিক সেকেন্ড-ইন-কমান্ড
আবুজা / ওয়াশিংটন — আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের নেটওয়ার্কে বড়সড় আঘাত হানল মার্কিন ও নাইজেরীয় সামরিক বাহিনী।
এক অত্যন্ত জটিল ও গোপন যৌথ অভিযানে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইসিস) বৈশ্বিক স্তরের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আবু-বিলাল আল-মিনুকিকে নির্মূল করা হয়েছে।
ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে শুক্রবার গভীর রাতে এই বিশেষ অভিযানের খবরটি প্রকাশ্যে আনা হয়। মার্কিন প্রশাসন আল-মিনুকিকে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম "সবচেয়ে সক্রিয় ও বিপজ্জনক সন্ত্রাসী" হিসেবে বর্ণনা করেছে, যে বিশ্বজুড়ে আইসিসের বিভিন্ন নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর সামাজিক মাধ্যম 'ট্রুথ সোশাল'-এ এই সাফল্যের ঘোষণা দিয়ে লিখেছেন, "সে আর আফ্রিকার সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালাতে পারবে না, কিংবা আমেরিকানদের লক্ষ্য করে কোনো হামলার ছক কষতেও সক্ষম হবে না। তার এই অপসারণের ফলে আইসিসের বিশ্বব্যাপী কর্মকাণ্ডের ভিত অনেকটাই দুর্বল হয়ে গেল।"
সাহেল অঞ্চলের নেটওয়ার্ক ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
নাইজেরিয়ার নাগরিক আল-মিনুকি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় ছিলেন। ২০২৩ সালে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট তাকে আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে আইসিসের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করে।
গোয়েন্দা সূত্র অনুযায়ী, তিনি আইসিসের ‘জেনারেল ডিরেক্টরেট অব প্রোভিন্সেস’ নামক কেন্দ্রীয় উইংয়ের অন্যতম শীর্ষ কর্মকর্তা ছিলেন। এই বিশেষ বিভাগটি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা আইসিসের স্থানীয় শাখাগুলোর কাছে রণকৌশলগত পরিকল্পনা ও বড় অঙ্কের তহবিল পৌঁছে দেওয়ার কাজ করত। বৈশ্বিক সন্ত্রাসে অর্থায়নের অভিযোগে ২০২৩ সালেই মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ তাকে ‘গ্লোবাল টেররিস্ট’ ঘোষণা করে তার ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল।
আফ্রিকার নতুন রণাঙ্গন
২০১৭ সালের পর ইরাক ও সিরিয়ায় আইসিসের মূল খেলাফত ও আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণ প্রায় শেষ হয়ে গেলেও, গোষ্ঠীটি আফ্রিকার বিভিন্ন প্রান্তে তাদের নেটওয়ার্ক বিকেন্দ্রীকরণ করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকাই হয়ে উঠেছে এই জঙ্গি সংগঠনের পুনরুত্থানের প্রধান ক্ষেত্র।
নাইজেরিয়া, মালি, বুর্কিনা ফাসো এবং নাইজারের মতো দেশগুলোতে ‘ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স’ (ISWAP) অত্যন্ত সক্রিয়। আন্তর্জাতিক ক্রাইসিস গ্রুপের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত কয়েক মাসে এই অঞ্চলের সরকারি সেনা ক্যাম্পগুলোর ওপর আইসিস এবং এর সহযোগী সংগঠনগুলোর আকস্মিক হামলা ও হিংসাত্মক তৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও সামরিক সমন্বয়
আল-মিনুকির বিরুদ্ধে এই সফল অভিযানটি আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পৃক্ততার একটি বড় উদাহরণ। এর আগে গত বছরের ক্রিসমাসের দিনেও নাইজেরিয়ায় আইসিসের একাধিক গোপন প্রশিক্ষণ শিবিরে বিমান হামলা চালিয়েছিল মার্কিন আফ্রিকা কমান্ড (AFRICOM)।
এই হাই-প্রোফাইল সাফল্য ওয়াশিংটন ও আবুজার মধ্যকার সামরিক সহযোগিতাকে একটি নতুন স্তরে নিয়ে গেল। কিছুদিন আগেই নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চলে সাধারণ মানুষের ওপর চলমান সহিংসতা দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে দেশটির ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল হোয়াইট হাউস। নাইজেরিয়া সরকার সে সময় তাদের ওপর আনা অভিযোগ অস্বীকার করলেও, বর্তমান এই যৌথ অপারেশনটি প্রমাণ করছে যে মাঠপর্যায়ে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ রুখতে দুই দেশের সামরিক ও গোয়েন্দা সমন্বয় এখনো কতটা জোরালো।
