ওয়াশিংটন: যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মধ্যকার দীর্ঘদিনের সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইরান ইস্যু এবং ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে দ্বন্দ্বে জার্মানি থেকে প্রায় ৫,০০০ মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত নির্দেশ দিয়েছে পেন্টাগন। এই সিদ্ধান্তটি কেবল সামরিক সংখ্যাতত্ত্ব নয়, বরং আটলান্টিক-পারের দেশগুলোর মধ্যকার ফাটলকেও স্পষ্ট করে তুলছে।


১. পেন্টাগনের সিদ্ধান্ত ও সময়সীমা

মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আনুষ্ঠানিকভাবে ৫,০০০ সেনা কমানোর নির্দেশ জারি করেছেন। পেন্টাগনের মুখপাত্র শিন পার্নেল জানিয়েছেন:

  • সময়সীমা: আগামী ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।

  • উদ্দেশ্য: ইউরোপে মার্কিন সামরিক শক্তির অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন এবং বর্তমান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অনুযায়ী সেনাদের নতুন বিন্যাস নিশ্চিত করা।

  • বর্তমান সেনা সংখ্যা: বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৬,০০০ মার্কিন সেনা রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সেনার সংখ্যা প্রায় ১৪ শতাংশ হ্রাস পাবে।

২. ট্রাম্প বনাম মার্জ: ইরান ও ইউক্রেন ইস্যুতে বাগযুদ্ধ

এই উত্তেজনার মূলে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জের মধ্যকার সরাসরি মতবিরোধ।

  • মার্জের সমালোচনা: চ্যান্সেলর মার্জ মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শক্তিশালী "এক্সিট স্ট্র্যাটেজি" বা প্রস্থান পরিকল্পনা নেই। তিনি আরও বলেন, ইরান সরকার ওয়াশিংটনকে "লজ্জিত" করছে।

  • ট্রাম্পের পাল্টা আক্রমণ: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্জের কড়া সমালোচনা করে বলেন, চ্যান্সেলর নিজের "ভেঙে পড়া দেশ," অভিবাসন এবং জ্বালানি সংকট নিয়ে ব্যস্ত না থেকে ইরান নিয়ে হস্তক্ষেপ করছেন। ট্রাম্প এমনকি ইউক্রেন যুদ্ধে মার্জকে "অকার্যকর" হিসেবে অভিহিত করেন।

৩. কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিগুলোর ভবিষ্যৎ

জার্মানি হলো ইউরোপে মার্কিন সামরিক শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে:

  • রামস্টাইন বিমান ঘাঁটি (Ramstein Air Base): এটি কেবল জার্মানি নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকায় মার্কিন সামরিক অভিযানের প্রধান লজিস্টিক হাব।

  • অন্যান্য ঘাঁটি: স্টুটগার্টে অবস্থিত মার্কিন ইউরোপীয় কমান্ড (EUCOM) এবং আফ্রিকা কমান্ড (AFRICOM)-এর ওপরও এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও পেন্টাগন সুনির্দিষ্ট কোনো ইউনিটের নাম প্রকাশ করেনি, তবে পদাতিক সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

৪. ইতালি ও স্পেনের প্রতি হুঁশিয়ারি

ট্রাম্পের এই কঠোর অবস্থান কেবল জার্মানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে:

  • ভবিষ্যতে ইতালি এবং স্পেন থেকেও সেনা প্রত্যাহার করা হতে পারে।

  • তাঁর অভিযোগ, যখন যুক্তরাষ্ট্র ইরান বা লোহিত সাগরে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা রক্ষার চেষ্টা করে, তখন এই দেশগুলো পর্যাপ্ত সহায়তা দেয় না।

৫. জার্মানির প্রতিরক্ষা বাজেটে আমূল পরিবর্তন

একসময় ন্যাটোর ২ শতাংশ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জার্মানি তার প্রতিরক্ষা খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে:

  • ৩ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা: জার্মানি এখন তাদের জিডিপির ৩ শতাংশের বেশি প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের পরিকল্পনা করছে।

  • স্বনির্ভরতা: জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস জানিয়েছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহার প্রত্যাশিত ছিল এবং ইউরোপকে এখন নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেই নিতে হবে।


৬. ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে উদ্বেগ

এই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ভীতি সৃষ্টি করেছে। পোল্যান্ড এবং বাল্টিক দেশগুলো যারা সরাসরি রাশিয়ার হুমকির মুখে রয়েছে, তারা মূলত মার্কিন সামরিক উপস্থিতিকে তাদের প্রধান ঢাল মনে করে। যুক্তরাষ্ট্রের এই "একতরফা" সিদ্ধান্ত ন্যাটোর ঐক্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।

সংক্ষেপে: ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে বিশ্লেষকরা মিত্রদের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে দেখছেন। এটি জার্মানিকে আরও বেশি সামরিক ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র নীতির সাথে একাত্ম হওয়ার জন্য একটি প্রচ্ছন্ন বার্তা।